স্টাফ রিপোর্টার:
বাজেট-পরবর্তী বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইস্যু নিয়ে জাতীয় সংসদের বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে জাতীয় সংসদের এলডি হলে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাজেট বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও অর্থনীতি নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, শাহজাহান চৌধুরী এমপি, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এমপি সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা, মো. সেলিম উদ্দিন, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ড. নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপিসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

মতবিনিময়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার বাজেট উপস্থাপনের আগেই বিরোধী দল একটি ছায়া বাজেট প্রকাশ করেছিল এবং তাদের মূল্যায়নের সঙ্গে চূড়ান্ত বাজেটের বেশ কিছু বিষয়ের মিল রয়েছে। তার মতে, বড় আকারের বাজেট প্রণয়নই মূল বিষয় নয়; বরং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। রাষ্ট্র পরিচালনায় দূরদর্শী নেতৃত্ব ও জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, গত দেড় দশকের বেশি সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। দুর্নীতি দমন এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া বাজেটের বাস্তব সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেটে ৬১টি পণ্যের ওপর কর কমানো বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, এর প্রভাব বাজারে পড়ে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তার মতে, কার্যকর বাজার তদারকি না থাকলে সাধারণ ভোক্তার পরিবর্তে অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সুবিধা পেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে তার দল শুরু থেকেই অবস্থান নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের দেওয়া সংস্কার-সংক্রান্ত ম্যান্ডেট যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ সীমিত হওয়ায় জনগণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দলের সব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও অহিংস হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদকে জবাবদিহি ও নীতিনির্ধারণের কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ছায়া মন্ত্রিসভাকে ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রবাসী শ্রমিকদের বিষয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান তিনি।
উন্নয়ন বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য থাকা উচিত নয়। তার ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সব নাগরিকই কর দেন, তাই উন্নয়ন বরাদ্দেও সমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের প্রচলিত আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াই যথেষ্ট এবং এ জন্য আলাদা কোনো সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রয়োজন নেই।
অর্থবছরের কাঠামো নিয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে সংসদে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতি তিন মাস অন্তর বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থাও চালুর দাবি জানানো হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির প্রতি দলের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
মতবিনিময় সভার শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান বিরোধীদলীয় নেতা।